ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র

0
152

নিউজ ডেস্ক : রাজধানীতে পানির সংকট নেই বলে ঢাকা ওয়াসা দাবি করলেও অনেক এলাকার গ্রাহক পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না। বেশ কিছু এলাকায় পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধজনিত সংকট চলছে। এসব এলাকার গ্রাহকেরা বাড়ির পানির বিল পরিশোধ করার পরও ওয়াসার পাম্পস্টেশন থেকে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়েই ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।

ওয়াসার দায়িত্বশীল সূত্রে এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার বাসাবো, মুগদা, মান্ডা, দোলাইরপাড়, দনিয়া, গোপীবাগ এলাকায় পানির সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে দুর্গন্ধের সমস্যা।

গতকাল সোমবার দুপুরে বাসাবোর কদমতলী সংসদ পানির পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশের এলাকাবাসী পানি সংগ্রহে ব্যস্ত। এলাকায় টানা এক মাসের বেশি বিশুদ্ধ পানির সংকট চলছে। কদমতলী প্রাথমিক স্কুলের গলির বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা লুৎফুর রহমান বলেন, তাঁর বাসায় দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে। ফলে বাধ্য হয়ে পাম্প থেকে পানি নিয়ে যান। এখানে কার্ড ব্যবহার করে পানি কিনতে হয়। প্রতি লিটার ৪০ পয়সা দরে।

লুৎফুর রহমান ছাড়াও এলাকার বাসিন্দা কনক আহমেদ, আবদুল হাই, মিল্লাতুর রহমান বলেন, ঢাকায় পানির সংকট নেই বলে ওয়াসা মিথ্যাচার করছে। তাঁরা বলেন, শুধু পরিমাণের স্বল্পতাই সংকট নয়, পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকাও পানির সংকট হিসেবে গণ্য করা দরকার।

‘ড্রিংক ওয়েল’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ওয়াসা বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের সাহায্যে গভীর নলকূপের পানি শোধন করে বিক্রি করে। এ জন্য গ্রাহকদের নিবন্ধনও নিতে হয়। কদমতলী সংসদ পাম্পের অপারেটর মাহমুদুর রহমান জানান, সকালে ও সন্ধ্যায় প্রচুর ভিড় হয়।

ড্রিংক ওয়েলের প্রতিনিধি জাহিদ হাসান জানান, এখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার লিটার পানি শোধন করে এভাবে বিক্রি হয়। এখান থেকে পানি কেনার পর বিভিন্ন বহুতল ভবনের বাসিন্দারা একযোগে ভ্যান ভাড়া করেও পানি নিয়ে যাচ্ছেন। এতেও তাঁদের বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে।

মুগদা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওয়াসার ২ নম্বর পানির পাম্পে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহে মানুষের ভিড়। দক্ষিণ মুগদার বাসিন্দা শামসুন্নাহার বেগম জানান, কলে যে পানি আসে তা কালো, ফোটালে ফেনা বের হয়।

মান্ডায় গিয়ে দেখা যায়, এখানে পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র বসেনি। সরবরাহ অপ্রতুল। স্থানীয় হায়দার আলী স্কুলের একজন শিক্ষক বলেন, এলাকায় পানি কম আসে বলে ওয়াসার একশ্রেণির কর্মীর সহায়তায় অনেক বাড়িওয়ালা আলাদা লাইন নিয়েছেন। যাঁরা নিতে পারেননি, তাঁরা পানি পান না।

বেলা আড়াইটার দিকে বালুর মাঠ এলাকায় ওয়াসার পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ৩০ জন লোক পানির জন্য লাইন দিয়েছেন। দক্ষিণ কমলাপুর বাজার এলাকা থেকে আসা আবদুল লতিফ জানান, বাসার লাইনে পানি কম আসে। গন্ধও থাকে। পাম্পের অপারেটর আবদুল হামিদ বলেন, দিনে-রাতে এক হাজারের বেশি মানুষ পানি নিতে আসে।

গত ২৩ এপ্রিল মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২ নম্বর সড়কে পানির তীব্র সংকট। স্থানীয় বাসিন্দা নাবিল আহমেদসহ সাতজন বলেন, এলাকায় কমপক্ষে ২০০ ভবনে পানি প্রায় আসে না। ওয়াসার এই অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ হাবিব বলেন, তৈয়বা পাম্পের কাছে চাবির সমস্যা রয়েছে। সমাধান করতে হলে রাস্তা খুঁড়তে হবে। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অনুমতি দিচ্ছে না। ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ উদ্দীন বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী মেরামতের এক বছরের মধ্যে সড়ক খনন করার সুযোগ নেই।

মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আশপাশের এলাকায়ও পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। সেনপাড়া-পর্বতা এলাকার ওয়াসার পাম্পস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পানির সমস্যা জানাতে এসেছেন এলাকাবাসী। কয়েকজন গ্রাহক এই প্রতিবেদককে বলেন, গরম এলেই পানির সংকট অনেক বেড়ে যায়।

পানির সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার পরিচালক শহীদ উদ্দিন বলেন, পানির সংকট না বলে কিছু এলাকার পানি সমস্যা বলা ভালো। বিশুদ্ধ পানির অভাব কি সংকট নয়—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক এলাকায় ৫০ বছর আগের পাইপে পানি সরবরাহ হচ্ছে। পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে ময়লা ঢুকে পানি দুর্গন্ধ হয়। যত দিন পর্যন্ত পানির পাইপ বদলানো সম্ভব না হবে, তত দিন এ ধরনের সংকট থাকবে। এ বিষয়ে উদ্যোগও চলছে বলে জানান তিনি।

ওয়াসার কাগুজে হিসাব

ওয়াসার কাগুজে হিসাবে সায়েদাবাদ, চাঁদনী চক, নারায়ণগঞ্জ পানি শোধনাগার এবং ৮২৩টি গভীর নলকূপের সাহায্যে প্রতিদিন পানির উৎপাদন ২৪৫ কোটি লিটার। পানির চাহিদা ২৩৫ কোটি লিটার। বাস্তবে উৎপাদন কম হচ্ছে। পাম্পের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ-বিভ্রাটজনিত কারণে পানির উৎপাদন অনেক কম। অন্যদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ে। সে হিসাবে পানির চাহিদা বাড়ার হারও ধরা হয় ৫ শতাংশ। তাই পানির চাহিদাও অনেক বেশি। সূত্র : প্রথম আলো